সূর্যগ্রহণের সময় কী ঘটে প্রাণিজগতে?

   সূর্যগ্রহণের সংজ্ঞা



যখন চাঁদ তার পরিভ্রমণ (ট্রানজিটের) সময় পৃথিবী এবং সূর্যের মাঝখানে আসে, তখন সূর্য পৃথিবীর একজন পর্যবেক্ষকের বা দর্শকের কাছে আংশিক বা সম্পূর্ণ অদৃশ্য হয়ে যায়। এই ঘটনাকে সূর্যগ্রহণ বলা হয়।

সূর্যগ্রহণের সময় কী ঘটে প্রাণিজগতে? 

ইউরোপ-আমেরিকায় চলছে পূর্ণগ্রাস সূর্যগ্রহণ। সূর্যগ্রহণ নিয়ে নানান সংস্কার-কুসংস্কার রয়েছে মানুষের মধ্যে। কিন্তু দিনের বেলা হঠাৎ রাতের মতো অন্ধকার নেমে আসার প্রভাব প্রাণিকুলে কীভাবে পড়ে? 


বিশেষজ্ঞদের মতে, যুক্তরাজ্যের বিভিন্ন চিড়িয়াখানায় প্রস্তুতি নেওয়া হলেও ‍অন্ধকার আকাশ পশু-পাখিদের বিভ্রান্ত করতে পারে। নিশাচর প্রাণীরা, বিশেষত পেঁচা দিনের বেলায়ই রাত ভেবে জেগে যেতে পারে, ভেড়ার পাল খুঁজতে পারে ঘুমানোর জন্য জায়গা। এমনকি দিনের পাখিরা (Songbird) কলরব বন্ধ করেদিতে পারে।

 জেডএসএল লন্ডন-এর অমেরুদণ্ডী প্রাণী বিভাগের প্রধান ডেভ ক্লার্কের মতে, পূর্ণগ্রাস সূর্যগ্রহণ রাতে চলা পতঙ্গ ও প্রজাপতিদের চলাফেরাতেও বিঘ্ন সৃষ্টি করতে পারে, বিশেষত যারা দিক-নির্ধারণ করতে দিনের আলো ব্যবহার করে। 



তিনি বলেন, বছরের সবচেয়ে বড় সূর্যগ্রহণের সময় সূর্যের ৮৩ থেকে ৯৮ শতাংশ চাঁদের ছায়ায় ঢাকা পড়বে। সূর্যগ্রহণটি উত্তর আটলান্টিক থেকে আর্কটিক সার্কেল ধরে উত্তরমেরু পর্যন্ত অঙ্কিত রেখা বরাবর দেখা যাবে। একই কথা বলেন দ্য সোসাইটি ফর পপুলার অ্যাস্ট্রোনোমির (এসপিএ) ভাইস প্রেসিডেন্ট রবিন স্ক্যাগেল। 


তার মতে, নিজ কক্ষপথে আবর্তনের সময় চাঁদ পৃথিবী ও সূর্যের মাঝামাঝি চলে এলে এ সূর্যগ্রহণ হয় এবং প্রাণিকূলে এর প্রভাব পড়ে। দ্য ইউনিভার্সিটি অব ক্যামব্রিজের অ্যানিম্যাল ওয়েলফেয়ার অনুষদের এমেরিটাস অধ্যাপক ডোনাল্ড ব্রুম বলেন, প্রাণিকূলের ওপর সূর্যগ্রহণের প্রভাব এত বেশি যে একটু লক্ষ্য করলেই মানুষ বুঝতে পারবে তার আশে-পাশে অনেক পাখি গ্রহণের সময় ‍ডাকছে না। 

নিরাপদ ভেবে অনেক পাখি গাছের উঁচু ডালে বা নির্জন স্থানে চলে যেতে পারে। কারণ প্রতিটি প্রাণীরই ২৪ ঘণ্টার একটি নিয়মতান্ত্রিক কর্মতালিকারয়েছে। তারা বুঝতে পারে এটা রাত নয়, কিন্তু অস্বাভাবিক কিছু হচ্ছে। 


পোষা বিড়াল ও কুকুরও বিরক্ত বোধ করতে পারে। ব্রুম বলেন, প্রতি দিনই রাত আসে, এর মৌলিক কোনো পার্থক্য হয় না। তবে সকালে রোদের তীব্রতা একটু বেশি হলেও এসব প্রাণীদের বিরক্তি বোধ হয়। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, কুকুরের দিকে লক্ষ্য করলেই দেখতে পাবেন, তারা বেশ বিচলিত। কেননা তারা বোঝার চেষ্টা করছে আসলে কি হতে চলেছে। 

ভারতে পরিচালিত একটি গবেষণায় দেখা যায়, পেঁচা, বাদুড়, সকালের পাখি, দাঁড় কাক, গঙ্গা ফড়িং এবং মৌমাছির ওপর এর প্রভাব পড়বে। এর আগে ১৯৫৫ সালের জুন মাসে ভারতে জুয়োলোজিক্যাল জরিপে দেখা গেছে, ভোমরও তাদের চাকে পালিয়েছিল। এবারও এমন হতে পারে বলে ধারণা করছে গবেষকরা। 

গবেষকরা আরও মনে করছেন, আলো না থাকায় তাপমাত্রা কমে যাওয়ায় পোকা-মাকড়দের খাদ্য সংরক্ষণে বিশেষ ব্যবস্থা নিতে হবে। পাশাপাশি যোগাযোগেও তাদের বিকল্প ব্যবস্থা নিতে হতে পারে। ১৯৭৩ সালে গবেষকরা দেখেন, গর্তে বসবাসকারী কাঠবিড়ালও সূর্যগ্রহণের সময় বিচলিত হয়। 

গরুর ক্ষেত্রে বিষয়টি সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কেননা গরুর খাওয়া এবং বিশ্রামের সময় নিজের মতো করে ভাগ করে নেয়। আরেক গবেষক পলমার্ডিন, জলহস্তিরাও আতঙ্কিত হয়ে থাকে সূর্য গ্রহণের সময়। এমনকি গ্রহণ শেষেও তারা বিভ্রান্ত হয়, ঠিক কোন সময় চলছে তা নির্ধারণ করতে।


সূর্যগ্রহণ মানবদেহে কী প্রভাব ফেলে?

সূর্যগ্রহণে চাঁদ সূর্যকে ঢেকে ফেলে। এ সময় সূর্যের চারদিকে একটি বলয় বা চুড়ির মতো দেখা যায়। মহাজাগতিক এ ঘটনা ঘিরে যুগ যুগ ধরে নানান কথা রটেছে। তবে এখনকার বিজ্ঞান অনেক কুসংস্কার ভেঙে দিয়েছে। বিবর্তনের শুরু থেকে পৃথিবীজুড়ে এই সূর্য ও চন্দ্রগ্রহণ নিয়ে রয়েছে হাজারো জনশ্রুতি, কল্পকাহিনি ও কুসংস্কার। অনেকেই মনে করেন, এই মহাকাশীয় ঘটনাগুলো আমাদের স্বাস্থ্যের ওপর বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে সক্ষম। সেই প্রভাব আবার নেতিবাচক.

 আমাদের দেশে অনেকে বলেন, গর্ভাবস্থায় কোনো নারী সূর্যঅথবা চন্দ্রগ্রহণের সময় যদি কিছু কাটাকাটি করেন তাহলে গর্ভের সন্তানের নাকি অঙ্গহানি হয়। আসলে এগুলোর সবই কুসংস্কার। মূলত, প্রকৃতির এক অনন্য, অনবদ্য ও খুবই স্বাভাবিক একটি ঘটনা হচ্ছে এই সূর্য অথবা চন্দ্রগ্রহণ। এখানে ভিত্তিহীন গল্পগাথা বা কুসংস্কারের কোনো জায়গা নেই। 


পৃথিবী ও চাঁদ একটি নির্দিষ্ট নিয়মে সূর্যকে প্রদক্ষিণ করছে, এর ফলে সূর্যের বিপরীতে পৃথিবী এবং চাঁদের অবস্থান প্রতিনিয়ত পরিবর্তন হচ্ছে। এই পরিবর্তন হতে হতে চাঁদ, সূর্য ও পৃথিবী যখন একটি নির্দিষ্ট ফ্রেমে অবস্থান নেয় তখনই হয় সূর্য অথবা চন্দ্রগ্রহণ। 


 চাঁদ যখন সূর্য ও পৃথিবীর মাঝখানে, সূর্য তখন চাঁদের ওপর সরাসরি আলো ফেলে। এর ফলে চাঁদের ছায়া সোজা গিয়ে পড়ে পেছনে থাকা পৃথিবীর ওপর। পৃথিবীর যে অংশে চাঁদের এই বিশাল ছায়া পড়ে, দিনের বেলাতেই সেই অংশ অন্ধকার হয়ে যায়। আর তখন সূর্যের দিকে তাকালে মনে হবে যে সূর্য অন্ধকারে মিলিয়ে যাচ্ছে। আসলে সূর্য অন্ধকারে মিলিয়ে যাচ্ছে না বা কোনো রাক্ষসও সূর্যকে গিলে ফেলছে না।


মানুষের উপর সূর্য গ্রহণের প্রভাব

 প্রকৃতপক্ষে এখানে চাঁদ সূর্যের বরাবর আসায় সূর্য চাঁদের আড়ালে চলে যায়। চাঁদের অবস্থানের ওপর নির্ভর করে কখনো চাঁদ পুরোপুরি অথবা কখনো আংশিকভাবে সূর্যকে আড়াল করে। একেই আমরা যথাক্রমে পূর্ণ ও আংশিক সূর্যগ্রহণ বলি। 



 সূর্যগ্রহণ ঘিরে মিথ ও বিশ্বাসের তালিকা অনেক বড়, তবে এটি অবশ্যই লক্ষ রাখতে হবে যে এগুলোর কোনোটিরই বৈজ্ঞানিক কোনো ভিত্তি নেই। এই বিশ্বাসগুলোর বেশিরভাগই প্রতিষ্ঠা পেয়েছে কেবল ধারণার উপর ভিত্তি করে। পূর্ণ সূর্যগ্রহণের সময় বায়ুমণ্ডলে ক্ষতিকারক বিকিরণ নির্গত হয়, এমন ধারণা অনেকের। যদিও নাসার বিজ্ঞানীরা প্রমাণ করেছেন এই ধারণা পুরোপুরি ভিত্তিহীন। তবে সূর্যগ্রহণের সময় সূর্যের দিকে সরাসরি তাকানো বারণ। কারণ, যেকোনো সময়েই সূর্যের দিকে সরাসরি তাকাতে নেই। সে হোক গ্রহণের সময়, কিংবা স্বাভাবিক সময়ে। 


সূর্যগ্রহণ দেখতে একসময় কাঁসার পাত্রে পানি থেকে শুরু করে ব্যবহার হয়েছে কাজে লাগে না এমন এক্সরে প্লেটও। এখন অবশ্য বিশেষ রোদচশমা দিয়ে সূর্যগ্রহণ দেখা যায়। সূর্যগ্রহণ নিয়ে কোনো কুসংস্কারে পাত্তা দেওয়ার কোনো মানে নেই।


 সূর্যগ্রহণ আসলে একটি রঙিন এবং আকর্ষণীয় মহাজাগতিক ঘটনা। চাঁদ যখন পৃথিবীর চারদিকে ঘোরে, কখনও কখনও তার কক্ষপথের সময় চাঁদ সূর্য এবং পৃথিবীর মধ্যে পড়ে। নক্ষত্র থেকে আলোর বিচ্ছুরণ তখন অবরুদ্ধ হয়, যার ফলে সূর্যগ্রহণ হয়। 


এ সময় চাঁদ পৃথিবীকে তার ছায়ায় ঢেকে রাখে। একটি আংশিক সূর্যগ্রহণ ঘটে যখন চাঁদ আংশিকভাবে সূর্যকে ঢেকে দেয়। অনেকেই হয়তো জানেন যে, খালি চোখে সূর্যগ্রহণ দেখা চোখের জন্য ক্ষতিকর কিন্তু কেন? আসলে এটা কি বাস্তব নাকি সাধারণ কাল্পনিক?


 এটি কেবল একটি পৌরাণিক কাহিনী নয়, তবে বৈজ্ঞানিক প্রমাণ রয়েছে। বিশেষ করে খালি চোখে সূর্যগ্রহণ দেখার চেষ্টা করলে চোখের রেটিনা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে বলে বিভিন্ন বৈজ্ঞানিক গবেষণায় জানা গেছে। খালি চোখে সূর্যগ্রহণ দেখার ফলে সৌর রেটিনোপ্যাথি হতে পারে। আলোর এই এক্সপোজার রেটিনার (চোখের পিছনে) কোষগুলিকে ক্ষতি করতে বা এমনকি ধ্বংস করতে পারে। এক্ষেত্রে চোখে ব্যথা না থাকলেও অন্ধত্ব, দৃষ্টি বিকৃত, রং পরিবর্তন ইত্যাদি হতে পারে। আপনার চোখে কোনো সমস্যা আছে কিনা তা জানতে সূর্যগ্রহণ দেখতে কয়েক ঘণ্টা থেকে কয়েক দিন সময় লাগতে পারে। 

সূর্যগ্রহণ দেখার পর আপনার চোখে কোনো পরিবর্তন লক্ষ্য করলে বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিন। 


সূর্যগ্রহণের সময় আপনার চোখ রক্ষা করতে আপনার কী করা উচিত? 


সম্পূর্ণ সূর্যগ্রহণের সময়, আপনি কোনও বিশেষ সুরক্ষামূলক সরঞ্জাম ছাড়াই নিরাপদে সূর্যগ্রহণ দেখতে পারেন। এটি ঘটে যখন চাঁদ সম্পূর্ণরূপে সূর্যকে ঢেকে দেয়। যাইহোক, যথাযথ নিরাপত্তা সরঞ্জাম বা কৌশল ছাড়া আংশিক সূর্যগ্রহণ দেখা নিরাপদ নয়। এক্ষেত্রে চোখের ক্ষতিও হতে পারে। নিরাপদে সূর্যগ্রহণ দেখার জন্য এখানে কিছু সহজ উপায় রয়েছে:


 পিনহোল প্রজেকশন: এটি সূর্যগ্রহণ দেখার সবচেয়ে নিরাপদ এবং সহজ উপায়। এক্ষেত্রে সরাসরি সূর্যগ্রহণ দেখার প্রয়োজন নেই। কার্ডবোর্ডের টুকরোতে একটি গর্ত করে আপনি সূর্যগ্রহণ দেখতে পারেন। একপাশে সূর্য এবং অন্য দিকে চিত্র প্রদর্শনের জন্য কাগজের টুকরো তিন ফুট I'll রাখুন। তবে গর্ত দিয়ে সূর্যের দিকে তাকাবেন না।


  ওয়েল্ডারের গ্লাস নং 14 সূর্যগ্রহণ দেখার জন্য কার্যকর সুরক্ষা প্রদান করে। আপনি এটি আপনার স্থানীয় ওয়েল্ডিং সরবরাহের দোকানে খুঁজে পেতে পারেন। তবে গ্লাসে কোনো স্ক্র্যাচ বা ক্ষতি হলে তা ব্যবহার করবেন না। 


মাইলার ফিল্টার: অ্যালুমিনাইজড মাইলার প্লাস্টিকের শীট সানগ্লাস ব্যবহার করে সূর্যগ্রহণের সময় চোখের উপর পরা যেতে পারে। আপনার যদি এমন সানগ্লাস না থাকে তবে এই শীট দিয়ে একটি বাক্স তৈরি করুন। কিন্তু শীটে কোন স্ক্র্যাচ থাকলে এটি ব্যবহার করবেন না।


 অন্যান্য উপায় নিরাপদে গ্রহন দেখার অন্যান্য উপায় হল টেলিভিশনে বা প্ল্যানেটেরিয়ামে।

 স্মার্টফোনের ক্যামেরায় সূর্যগ্রহণ দেখা বা ছবি তোলার জন্য একই ক্যামেরা দিয়ে ক্যামেরা লাইন আপ করলে সূর্যকে ভুলভাবে দেখা যেতে পারে। এক্ষেত্রে চোখ এবং স্মার্টফোনের ক্যামেরা উভয়ই ক্ষতিগ্রস্ত হবে। তাই কোনো ঝুঁকি নেবেন না। ক্যামেরা ভিউ কখনই ক্যামেরার অপটিক্যাল ভিউফাইন্ডারের মাধ্যমে গ্রহন দেখবেন না। এটি সরাসরি দেখে আপনার চোখের ক্ষতি করতে পারে।


 অনিরাপদ ফিল্টার গ্রহন দেখার জন্য বিশেষভাবে ডিজাইন না করা হলে, কোনো অপটিক্যাল ডিভাইস (টেলিস্কোপ, বাইনোকুলার ইত্যাদি) কোনো ফিল্টার ব্যবহার করা নিরাপদ নয়। ফটোগ্রাফিক নেগেটিভ (এক্স-রে এবং স্ন্যাপশট), স্মোকড গ্লাস, সানগ্লাস (একক বা একাধিক), ফটোগ্রাফিক নিরপেক্ষ ঘনত্বের ফিল্টার এবং ফিল্টার পোলারাইজার সহ সমস্ত ধরণের রঙিন ফিল্ম, রূপালীহীন কালো এবং সাদা ফিল্মগুলি দেখার জন্য অনিরাপদ ফিল্টার।


 এছাড়া সস্তা টেলিস্কোপ আইপিসের জন্য ডিজাইন করা সৌর ফিল্টারগুলিও অনিরাপদ। এই আইটেমগুলি চোখের ক্ষতির ঝুঁকি বাড়াতে পারে।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ