সূর্যোদয় ও সূর্যাস্তের সময় সূর্য কেন লাল দেখায় ?
আমারা অনেকেই হয়তো লক্ষ করে থাকব যে দিনের বিভিন্ন সময় সূর্যকে বিভিন্ন রঙের দেখতে পাই। যেমন ভোর বা সন্ধ্যার কথা বিবেচনা করলে দেখা যায় যে এ সময় সূর্যকে অন্য সময়ের তুলনায় অনেক বেশি লাল দেখা যায়। বিশেষ করে সন্ধ্যার সময় দেখা যায় যে আকাশ রক্তিম আকার ধারণ করে। শুধু তাই নয় মাঝে মাঝে সূর্যাস্তের সময় সম্পূর্ণ সূর্য রক্তিম বর্ণ ধারণ করতে দেখা যায়।
তো এমনটা ঘটে কেন?চলুন জেনে নেওয়া যাক কেন সূর্যোদয় বা সূর্যাস্তের সময় দিনের অন্যান্য সময়ের তুলনায় আকাশকে বেশি লাল দেখায়?
আসলে এ পুরো ঘটনাটার জন্য দায়ী আলোর বিক্ষেপণ। এক কথায়, লাল আলোর বিক্ষেপণ কম হওয়ার কারণে আমরা সূর্যোদয় এবং সূর্যাস্তের সময় সূর্যকে এত বেশি লাল দেখতে পাই।
আরো বিস্তারিত ভাবে জানতে চাইলে আমাদের আগে জানতে হবে আলোর বিক্ষেপণ কিভাবে কাজ করে?
যখন কোন আলোক তরঙ্গ এর যাত্রাপথে কোন ক্ষুদ্র কণার ওপর পড়ে, তখন ক্ষুদ্র কণাগুলো আলোক তরঙ্গকে চার দিকে ছড়িয়ে দেয়। আলোক তরঙ্গকে সবদিকে ছড়িয়ে দেওয়ার এই ঘটনাকে বলা হয় আলোর বিক্ষেপণ।
চলুন একটি উদাহরণ দেওয়া যাক। মনে করুন,আপনি একটি পানি ভর্তি প্রশস্ত একটি বড় পাত্র নিয়েছেন। এবার পানির মধ্যে কয়েকটি ছোট ছোট বল রাখুন ( বল গুলো পানিতে অবশ্যই ভাসতে হবে)। তারপর পানির পৃষ্ঠে সামান্য আঘাত করে মৃদু ঢেউ এর সৃষ্টি করুন। দেখা যাবে যে আপনার আঘাতে পানির পৃষ্ঠে সৃষ্ট মৃদু ঢেউ সবদিকে সমান ভাবে ছড়িয়ে পড়ছে। একই সাথে আপনার রাখা বলগুলোতে ঢেউ বাধাপ্রাপ্ত হয়ে পুনরায় বিপরীত দিকে ঢেউ সৃষ্টি করছে। অর্থাৎ আপনার রাখা বলগুলো আপনার উৎপন্ন করা ঢেউ কে পুনরায় সবদিকে সমান ভাবে ছড়িয়ে দিচ্ছে।
আলোর বিক্ষেপণ কেও প্রায় একইভাবে কল্পনা মনে করতে পারেন। যেমন আপনার ঢেউ উৎপন্ন করার স্থানটিকে সূর্যের অবস্থান ধরে নিতে পারেন। আর বলের জায়গায় কল্পনা করতে পারেন আমাদের বায়ুমণ্ডলে থাকা ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা বিভিন্ন গ্যাসের কণা।
সূর্যের আলো যখন পৃথিবীতে আসে তখন আমাদের বায়ুমণ্ডলে বিভিন্ন গ্যাসের সাথে সূর্যের আলোর সংঘর্ষ ঘটে থাকে। সূর্যের এই আলোর তরঙ্গকে বায়ুমণ্ডলে থাকা বিভিন্ন গ্যাসীয় অণু সবদিকে ছড়িয়ে দেয়।
এখন প্রশ্ন হল আলোর বিক্ষেপণের সাথে লাল রং এর সম্পর্ক কি?
আমরা জানি, সূর্যের আলো হল সাত রং এর সমষ্টি। অর্থাৎ সূর্যের আলোকে বিশ্লেষণ ( সূয্যের আলো প্রিজম এর মাধ্যমে ভাঙ্গলে ৭ টি রং দেখা যাবে) করলে সাতটি রঙ পাওয়া যাবে যেমনটা আমরা রংধনু তে দেখে থাকি।
মূলত সকল তরঙ্গেরই একটি সুনির্দিষ্ট তরঙ্গদৈর্ঘ্য (wavelength)থাকে। দৃশ্যমান আলোরও নির্দিষ্ট তরঙ্গদৈর্ঘ্য আছে। আমরা সাধারণত ৪০০-৭০০ ন্যানো মিটার nm তরঙ্গদৈর্ঘ্যের তরঙ্গ (wave)দেখতে পাই এবং এই দৃশ্যমান আলোর মধ্যে তরঙ্গদৈর্ঘ্যের পার্থক্যের আমরা বিভিন্ন রঙ এর আলো দেখে থাকি।
দৃশ্যমান আলোর তাদের তরঙ্গদৈর্ঘ্য (wavelength) অনুসারে সাজালে যে ক্রমটি হয় তা হল-
১.বেগুনী=৩৮০ থেকে ৪৫০ ন্যানোমিটার (nm) এর মধ্যে হয়।
২.নীল=৪৫০ থেকে ৪৯৫ ন্যানোমিটার (nm) এর মধ্যে হয়।
৩. আসমানি=৪৯৫ থেকে ৫৭০ ন্যানোমিটার (nm) এর মধ্যে হয়।
৪. সবুজ=৪৯৫ থেকে ৫৭০ ন্যানোমিটার (nm) এর মধ্যে হয়।
৫. হলুদ=৫৭০ থেকে ৫৯০ ন্যানোমিটার (nm) এর মধ্যে হয়।
৬.কমলা=৫৯০ থেকে ৬২০ ন্যানোমিটার (nm) এর মধ্যে হয়।
৭. লাল=৬২০ থেকে ৭৫০ ন্যানোমিটার (nm) এর মধ্যে হয়।
অর্থাৎ, নীল আলোর তরঙ্গদৈর্ঘ্য সবচেয়ে কম (৩৮০ থেকে ৪৫০ ন্যানোমিটার (nm) এর মধ্যে হয়।) এবং লাল আলোর তরঙ্গদৈর্ঘ্য সবচেয়ে বেশি (৬২০ থেকে ৭৫০ ন্যানোমিটার (nm) এর মধ্যে হয়।) । যে আলোর তরঙ্গদৈর্ঘ্য যত বেশি তার বিক্ষেপণ (reflection of light) তত কম হয় আবার যার তরঙ্গদৈর্ঘ্য যত কম তার বিক্ষেপণ তত বেশি। যেহেতু নীল আলোর তরঙ্গদৈর্ঘ্য সবচেয়ে কম (৩৮০ থেকে ৪৫০ ন্যানোমিটার ) তাই এটি সবচেয়ে বেশি বিক্ষেপিত হয় এবং লাল আলোর তরঙ্গদৈর্ঘ্য সবচেয়ে বেশি (৬২০ থেকে ৭৫০ ন্যানোমিটার nm) বলে তা সবচেয়ে কম বিক্ষেপিত হয়। আবার নীল আলোর তরঙ্গদৈর্ঘ্য (wavelength) কম হওয়ার জন্য আমরা আকাশকে নীল দেখে থাকি।
সূর্যোদয় এবং সূর্যাস্তের সময় সূর্য প্রায় দিগন্তরেখার কাছাকাছি চলে আসে এবং সূর্যালোক আমাদের চোখে পৌঁছুতে পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলের সবচেয়ে ভারী স্তর ভেদ করে আসতে হয়। ফলে আলোকরশ্মিকে বায়ুমণ্ডলের মধ্য দিয়ে যাওয়ার সময় দিনের অন্যান্য সময়ের তুলনায় সূর্যোদয় এবং সূর্যাস্তের সময় বেশি দুরত্ব অতিক্রম করতে হয়।
এতে করে আলোক রশ্মিকে অন্যান্য সময়ের তুলনায় ভাসমান ধূলিকণা, পানি-কণার সাথে সবচেয়ে বেশি সংঘর্ষে লিপ্ত হতে হয়। এই সংঘর্ষের কারণে আলোর reflection হয়। নীল প্রান্তের কম তরঙ্গদৈর্ঘ্যবিশিষ্ট বর্ণগুলো অধিক Reflect হতে থাকে (যেহেতু তরঙ্গদৈর্ঘ্য কম), কিন্তু লাল প্রান্তের আলোর তরঙ্গদৈর্ঘ্য বেশি হওয়ায় তা কম Reflect হয়। এতে করে লাল আলো সাবদিকে ছড়িয়ে না পড়ে সরাসরি চলে আসে। ফলে সূর্যালোক যখন এই দীর্ঘ বায়ুমণ্ডল পাড়ি দিয়ে আমাদের চোখে আসে তখন লাল রঙের আলোই সবচেয়ে বেশি পরিমাণে আসে। যার ফলাফল হিসেবে আমরা সূর্যাস্ত ও সূর্যোদয়ের সময়ে আকাশকে দিনের অন্যান্য সময়ের তুলনায় অধিক লাল দেখি।

0 মন্তব্যসমূহ