'পাখি না থাকলে, বেঁচে থাকবে না বন’
![]() |
| পাখির খাবার খাওয়ার দৃশ্য |
বন বৃদ্ধির ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় অবদান পাখির। পশু-পাখিরাই বন তৈরি করে। কারণ বনের যে বড় বড় গাছপালা রয়েছে সেগুলো পাখিদের কল্যাণেই গড়ে ওঠা। পাখি না থাকলে বনও বেঁচে থাকবে না বলে এমনটাই ধারণা করেন প্রখ্যাত পাখি বিশেষজ্ঞ ও বাংলাদেশ বার্ড ক্লাবের প্রতিষ্ঠাতা ইনাম আল হক।
তিনি বলেন, ফরেস্টের (বনের) যে বড় বড় গাছ হয় সেগুলোর পেছনে পাখির অবদান। গাছগুলোর বীজ বাতাসে নিতে পারে না(বহন করে ডিম্বাণুর কাছে নিতে পারে না), কিংবা পোকমাকড়ও নিতে পারে না।
সেগুলো পশু এবং পাখি নিতে পারে। পশু যেহেতু বনের বেশি গভীরে যায় না, সেহেতু বন তৈরি এবং বড়( বৃদ্ধি) করার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি অবদান পাখির।
![]() |
| মাছের খোজে বক |
পাখিরা গাছের ফল খেয়ে এর বীজ যখন দূর দূরান্তে নিয়ে গিয়ে ফেলে তখনই সেই গাছ অঙ্কুরিত হয়। বনের যত ক্ষতি যেমন মাঝখানে গ্যাপ হয়ে গেল, ভূমিধ্বসে গাছ মারা গেল এসব জায়গার গ্যাপগুলো পরবর্তীতে গাছোলা ধারা পূর্ণ করে পাখি।
‘অনেক কিছুর মাধ্যমে বন সৃষ্টি হলেও পাখির ভূমিকা কিন্তু সবার প্রপ্রথমে। পাখিরা বন তৈরি করে, বনকে সম্প্রসারণ করে এবং বনকে বিভিন্ন ক্ষতির হাত থেকে রক্ষা করে ।
যেহেতু বহুদিন ধরে এই কাজ করে তাই আমরা বুঝতে পারি না। ’
আরেকটা হলো, যেটুকু বন অবশিষ্ট আছে সেটাকেও রক্ষার দায়িত্ব পালন করে বনের পাখি । বনের গাছের পাতায় প্রচুর পোকা-মাকড়ের জন্ম হয়। লক্ষ, কোটি প্রজাপতি, মথ এবং অন্যান্য পোকা-মাকড় ডিম পাড়ে গাছের পাতায় এবং সেই সাথে বনের গাছের পাতা খেয়েই বড় হয় এই পোকামাকড় । বড় হয়ে আবার মথ, প্রজাপতি এবং অন্যান্য পোকামাকড় হয়। এই পোকাগুলো থেকে গাছকে রক্ষা করে রাখে পাখি। কিভাবে রক্ষা করে? কারণ হলো পাখি সেইসব পোকামাকড় খেয়ে পোকামাকড়ের বংশ বৃদ্ধি রোধ করে। যার ফলে গাছের পাতা রক্ষা পায় পোকামাকড় থেকে।
![]() |
| মগডালে চরুই পাখি |
পোকাখাওয়া পাখি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, পৃথিবীর প্রায় ৭০-৭৫ ভাগ পাখিই পোকামাকড় খেয়ে বেঁচে থাকে। লক্ষ, কোটি পোকা খেয়ে যাচ্ছে বলেই পাতাগুলো বেঁচে যাচ্ছে। পাতাই হলো গাছের জীবন ও সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ। পাতা থেকেই গাছ তার খাদ্য তৈরি করে। তাই বলায় যায়, বন টিকিয়েও রাখে পাখি ।
ইতালির মিউজিয়ামে প্রদর্শিত ‘পাখিহীন বন’ বিষয়ক শিল্পকর্মপৃথিবীতে ধ্বংস হয়ে যাওয়া একটি বনের উদাহরণ টেনে তিনি বলেন, ইতালিতে একটা মৃত আগ্নেয়গিরির জ্বালামুখের চারদিকে বড় এবং গভীর বন হয়েছিল। প্রাচীনকালের পেন্টিং (কার্বন পরিক্ষা) থেকে তা বোঝা যায়। ওই বনের নাম হয়েছিল (forest without bird) ‘পাখিহীন বন’।
পাখিহীন বন এজন্য বলা হয় তার কারণ ওই আগ্নেয়গিরির জ্বালামুখ থেকে যে গ্যাস বেরুতো তা পাখি সহ্য করতে পারতো না । তাই পাখিরা সবাই ওই বন ছেড়ে অনেক দূরে চলে গিয়েছিল। ফলে ১০০ থেকে ১২০ বছরের মধ্যে ওই বনটা সম্পূর্ণভাবে ধ্বংস হয়ে যায়। এর একমাত্র কারণই হলো সেই বনে কোনো পাখি ছিল না বলে। সেই ১০০ বা ১২০ বছর আগের ছবিও আছে ওই বনের। ‘পাখিহীন বন’ এর ছবি এবং পরবর্তীতে ‘গাছহীন বন’ এর ছবি(picture) পাশাপাশি দু’টো ছবিই রয়েছে ইতালির সেই মিউজিয়ামে।
ইনাম আল হক বলেন, যদি পাখি না থাকে তবে ১০০ বছর কোনো বন জঙ্গল বেঁচে থাকবে না। পোকারা গাছের সব পাতা খেয়ে শেষ করে ফেলবে; তখন গাছগুলো মরে গিয়ে বন ধ্বংস হয়ে যাবে শুধু বেঁচে ঘাস, ঘাস কিন্তু পোকা ধ্বংস করতে পারে না। আর যদি কখনো কোনো কারণে ঘাসগুলোও মরে যায় তবে তখন সেই বন মরুভূমি হবে। যেটা আমরা দেখতে পাই না - সুতরাং আমরা বলতেই পারি গাছপালা রক্ষা করে বনভূমিকে টিকিয়ে রেখেছে একমাত্র পাখি।
আমাদের দেশে যতটুকু বন অবশিষ্ট রয়েছে তা সুষ্ঠ রক্ষণাবেক্ষসহ পাখিদের অভয়ারণ্য (without fear) গড়ে তোলার মাধ্যমেই তা টিকিয়ে রাখা সম্ভব বলে জানান প্রখ্যাত পাখি বিজ্ঞানী ইনাম আল হক।
বন রক্ষায় পাখির গুরুত্ব
![]() |
| বনের চরইপাখি |
বাংলাদেশের বনভূমিগুলোর মধ্যে অন্যতম চিরসবুজ বনভূমি। আমাদের দেশের পাখিদের একটি বড় অংশের দেখা পাওয়া যায় এই বনভূমিগুলোতে। এসব পাখি সৌন্দর্যবর্ধনের পাশাপাশি চিরসবুজ বনের প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষায় পালন করছে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা।
বাংলাদেশের চিরসবুজ ও মিশ্র-চিরসবুজ বনভূমিগুলোতে বিভিন্ন প্রজাতির উদ্ভিদের সমারোহ থাকার কারণে বেশ কিছু প্রজাতির পাখি এসব বনে পাওয়া যায় যাদের অন্য বনে দেখা যায় না। চিরসবুজ বনের পাখিদের মধ্যে রয়েছে ময়না, টিয়া, ধনেশ, হরিয়াল, নীলকণ্ঠ, ভীমরাজ, মৌটুসিসহ অন্যান্য পাখি। এসব পাখিআকার-আকৃতি, বর্ণ এবং স্বভাবে বেশ বৈচিত্র্যময়।
নানা প্রজাতির স্থানীয় পাখির সঙ্গে শীতকালে যোগ দেয় পরিযায়ী পাখির দল। এদের বিচরণে চিরসবুজ বন হয়ে ওঠে হাজারো পাখির স্বর্গরাজ্য। বনের খাদ্যশৃঙ্খলে স্বাভাবিক ধারা বজায় রাখা, ক্ষতিকর কীটপতঙ্গ নিয়ন্ত্রণ, উদ্ভিদের পরাগায়ণ ও বীজের বিস্তারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে এই পাখিদের। তবে পরিবেশ বিপর্যয়ের ফলে অস্তিত্বের হুমকিতে পড়েছে বনের এই পাখিরা। ক্রমাগত বনভূমি উজাড় করার ফলে বনের পাখিরা তাদের আবাসস্থল হারাচ্ছে।
একই সঙ্গে বনাঞ্চলে ফলজ উদ্ভিদ কমে যাওয়ায় খাদ্যসঙ্কটে ভুগছে তারা। ফলে বেশ কিছু পাখি এখন বিপন্ন, এতে ভারসাম্য বিঘ্নিত হচ্ছে গোটা বনের প্রতিবেশ ব্যবস্থায়। তাই চিরসবুজ বনের পাখি সংরক্ষণে প্রাকৃতিক বনভূমি রক্ষার কোনো বিকল্প নেই।




0 মন্তব্যসমূহ